অপদান ভূমিকা

ভূমিকা

পালি অপদান সাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী যাকে বৌদ্ধ সংস্কৃত সাহিত্যে অবদান বলা হয়। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে অপদান শব্দটির চেয়ে অবদান শব্দটি বেশি পরিচিত। শব্দগত দিক থেকে চিন্তা করলে অবদান অর্থ যা দাঁড়ায় তা হলো উল্লেখযোগ্য কর্ম, মহৎ কর্ম, প্রশংসনীয় কর্ম বা মহৎ ব্যক্তিবর্গের জীবনী, জীবনচরিত ইত্যাদি। পণ্ডিতদের গবেষণামতে এই সাহিত্য রচিত হয়েছিল আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১ম বা ২য় শতকের দিকে, যদিও কে রচনা করেছেন তাঁর নাম এখনো জানা সম্ভব হয়নি। স্বভাবতই এই অপদান সাহিত্যে কাকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে তা জানার আগ্রহ সবার কাছে আছে নিম্নে তা আলোচনা করছি। অপদান গ্রন্থের মধ্যে সাধারণত যা আলোচনা করা হয়েছে তা হলো:

১) বুদ্ধের অপদান ও জীবনী, ২) পচ্চেক বুদ্ধের অপদান ও জীবনী, ৩) থেরোদের অপদান ও জীবনী, এবং ৪) থেরীদের অপদান ও জীবনী।

তরুণ সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী স্নেহাস্পদ করুণাবংশ ভিক্ষু মহোদয় তাঁর অনুবাদেও এই অনুক্রম অনুসরণ করেছেন।

উক্ত ৪টি অংশকে ৫৯ ভাগে বা বর্গে বিভক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রথম ৫৫ বর্গ ৫৫০জন থেরোর জীবনী নিয়ে রচিত। এক একটি বর্গ আবার ১০টি জীবনী নিয়ে গঠিত। প্রতিটি বর্গের শেষে ওই বর্গটিকে কী নামে সম্বোধন করা হবে তারও উল্লেখ আছে। ১ম বর্গের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র অংশ বুদ্ধ-অপদান এবং পচ্চেক বুদ্ধ-অপদান নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। শেষের চারটি বর্গ ৪০জন থেরীর জীবনী নিয়ে গঠিত, যার প্রতিটি বর্গে ১০টি করে জীবনীর বর্ণনা করা হয়েছে। বাংলা ভাষায় আমার জানামতে এখনো পুরো অপদান গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়নি। এমনকি পুরো গ্রন্থটি ইংরেজি ভাষাতেও প্রকাশিত হয়নি।

বুদ্ধ-অপদানে বুদ্ধের মহত্ত্বতাকে নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এ অংশে বেদেহা থেরোর প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে বুদ্ধ নিজেই তাঁর মহত্ত্বতার কথা উপস্থাপন করেছেন। এ আলোচনায় বুদ্ধ তাঁর পূর্বজন্মের বিভিন্ন প্রকার কুশলকর্মের কথা তুলে ধরেছেন এবং ওই কর্মের ফলাফল নিয়েও আলোচনা করেছেন। বুদ্ধ-অপদান ৮১টি অনুচ্ছেদে শেষ হয়েছে এবং যেখানে বুদ্ধ ভিক্ষুদেরকে একতাবদ্ধতা, অপ্রমত্ততা এবং আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গকে অনুশীলনের কথা উপদেশ দিয়েছেন।

পচ্চেক বুদ্ধ-অপদানে, যাঁরা পরিনির্বাপিত হয়েছেন সেই পচ্চেক বুদ্ধগণের মহত্ত্বতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে বিশেষ করে সংযুক্ত নিকায়ের ১ম খণ্ডের ৩য় সূত্র খগবিসান সূত্রের মাধ্যমে পচ্চেক বুদ্ধের আলোচনা করা হয়েছে। ৪১টি গাথা বা স্তবকের মাধ্যমে সূত্রটি বর্ণনা করা হলেও পরবর্তীকালে ৮টি স্তবক সূত্রের প্রথম দিকে এবং ৯টি স্তবক সূত্রের শেষের দিকে সংযুক্ত করে সূত্রটি সর্বমোট ৫৮টি স্তবকের মাধ্যমে পচ্চেক বুদ্ধ-অপদানের বর্ণনা শেষ করা হয়েছে। এই অপদানের লক্ষযোগ্য দিক হলো অন্যান্য অপদানের চেয়ে ভিন্ন ছন্দের মাধ্যমে স্তবকগুলোর উপস্থাপন।

উল্লিখিত দুটি অপদান বিশেষভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে কোথাও বুদ্ধের বা বোধিসত্ত্বের জীবনী নিয়ে আলোকপাত করা হয়নি। এমনকি পচ্চেক বুদ্ধের জীবনী নিয়েও আলোচনা করা হয়নি। দুই অপদানে বর্ণিত স্তবকগুলো পড়লে মনে হয় এগুলো বুদ্ধের দ্বারা ভাষিত উদান-বাণী বা ভাবগম্ভীর উদাত্ত আহ্বান-যা মূল নিপাতের খগবিসান সূত্রে পরিদৃষ্ট হয়। আবার অন্যদিকে দীর্ঘনিকায়ের ২য় খণ্ডে মহাপদান সূত্রে অপদান অর্থ দাঁড়ায় বুদ্ধের বা মহান ব্যক্তির কাহিনী বা জীবনী-এখানে অবশ্য সপ্ত বুদ্ধের কথা বুঝানো হয়েছে।

থেরোপদানে ৫৫০ জন অর্হৎ থেরোদের মহত্ত্বতা নিয়ে বিধৃত হয়েছে। এখানে ২৩৪টি স্তবকের মাধ্যমে বুদ্ধের প্রধান শিষ্য সারিপুত্রকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পূর্বোক্ত দুটি অপদানের চেয়ে সারিপুত্রের অপদান অনেক বেশি স্তবকের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে। সারিপুত্রের পরে অন্যান্য প্রসিদ্ধ থেরোদের মধ্যে মহামোঙ্গলায়ন, মহাকাশ্যপ, অনুরুদ্ধ, উপালী, অঞকোণ্ডাণ্যসহ অন্যান্য থেরোদের জীবনী আলোচনা করা হয়েছে। সারিপুত্রের ন্যায় সব থেরোদের জীবনী তত বেশি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি। প্রায় প্রতিটি থেরোর জীবনীতে দেখা যায় তাঁরা কোনো এক বুদ্ধের সময়ে কোনো-না-কোনো কুশলকর্ম সম্পাদন করে পরবর্তী জীবনে তার সুফল ভোগ করেছেন এবং কোনো-না-কোনো সময় তা উপমাসহকারে বুদ্ধ সবার সম্মুখে উপস্থাপন করেন। আবার ইহাও দেখা যায় যে ওই মহান ব্যক্তিরাই বুদ্ধের সাক্ষাতে অর্হভফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। অপদানের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হলো জাতকের ন্যায় প্রায় সব জীবনীতে দেখা যায় যে অতীত এবং বর্তমান কাহিনীর সংশ্লিষ্টতা। জাতক অতীত বুদ্ধের জীবনকাহিনী আর অপদান হলো অতীত অর্হৎদের জীবনকাহিনী। তবে কয়েকটি অপদানে তার ব্যতিক্রম লক্ষণীয়।

থেরীপদানে ৪০জন প্রসিদ্ধ থেরীর মহত্ত্বতার কথা ফুটে উঠেছে। তাঁদের জীবনীগুলো তত বেশি বিস্তৃত নয়। ৪০জন থেরীর অপদান ৪টি ভাগে বিভক্ত। যার প্রতিটি বর্গে ১০জন থেরীকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বৌদ্ধ সাহিত্যেও ৪০জন প্রসিদ্ধ থেরীর জীবনী দৃষ্ট হয়। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: মহাপ্রজাপতি গৌতমী, ক্ষেমা, উৎপলবর্ণা, পটাচারা, কুণ্ডলকেশী, কৃশাগৌতমী, নন্দা, জনপদকল্যাণী, যশোধরা, রূপানন্দা এবং অম্রপালী। পরমার্থদীপনী গ্রন্থে প্রায় সব থেরো-থেরীদের জীবনী লক্ষ করা যায়-যা অপদানে সাহিত্য থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে মাঝে মাঝে কিছু ব্যতিক্রমও দেখা যায়, যেমন- থেরগাথা অষ্টকথায় উস্লভা থেরো যা অপদানে কুসম্বাপলিয়; থেরগাথায় ইসিদিন্ন কিন্তু অপদানে সুমনাবিজনিয় ইত্যাদি।

যদিও অপদানের পরে বুদ্ধবংশের স্থান কিন্তু একটি কারণে মনে হয় বুদ্ধবংশের স্থান অপদানের পূর্বে। কারণ, বুদ্ধবংশ গৌতম বুদ্ধসহ ২৫ জন বুদ্ধের আলোচনা পাওয়া যায়। খুব সম্ভবত বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন জীবনী সংগৃহীত হওয়ার কারণেও এরূপ পার্থক্য দেখা যাওয়া অবাস্তব নয়। বিস্তারিত Rhys David এবং Muller-এর অপদান সম্পর্কিত লেখা দেখা যেতে পারে।

নিশ্চিত করে বলা যায় যে, অপদান খুদ্দকনিকায়ের এবং ত্রিপিটকের একটি পরবর্তী সংস্করণ। B.C. Law তাঁর পালি সাহিত্যে (পৃ. ৭) উল্লেখ করেছেন দীর্ঘভানক এর তালিকায় খুদ্দকনিকায়ের ভিতরে এ গ্রন্থের নাম পাওয়া যায় না। কিন্তু মজিমভানক এর অন্তর্গত খুদ্দকনিকায়ের ১৩তম গ্রন্থ হিসেবে তার উল্লেখ দেখা যায়। এতে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, যখন দীর্ঘভানক রচিত হয় তখন অপদান গ্রন্থটি খুদ্দকনিকায়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এমনকি সম্ভবত ত্রিপিটকের মধ্যেও তাকে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। ইহাও উল্লেখ্য যে, যেখানে দীর্ঘনিকায়ে ৬জন বুদ্ধের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়, সেখানে অপদান গ্রন্থে পূর্বের ২৪ জন বুদ্ধের নাম উল্লেখ আছে-যা পরবর্তী সংযোজন হিসেবে পণ্ডিতেরা মনে করেন। B.C. Law ইহাও উল্লেখ করেছেন যে, একটি অপদান পরোক্ষভাবে কথাবন্ধুকে নির্দেশ করে। এমন হলে Rhys David ধারণা করেছেন যে, অপদান গ্রন্থটি সর্বশেষ পালি ত্রিপিটকের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে।

অপদান সাহিত্য বুদ্ধের শিক্ষার উচ্চতর কোনো উপদেশ দেখা যায় না, তবে এতে কিছু ধার্মিক ব্যক্তির মাধ্যমে কুশলকর্ম সম্পাদনের এবং কিছু ধর্মীয় আচারানুষ্ঠানের উপরই বেশি জোর দেয়া হয়েছে বলে মনে করা হয়, যেমন: পুজা, বন্দনা ও দান ইত্যাদি। প্রায় সময় কুশলকর্ম হিসেবে চৈত্য নির্মাণ করা, চৈত্য সম্মার্জন করা, চৈত্যকে সাদা রং করা, চৈত্যের চতুর্দিকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা, বোধিবৃক্ষের পরিচর্যা করা বা সাধারণ মানুষের জন্য উপকার করাকে উল্লেখ করা যায়। এভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে দান, মানবতা ও বৌদ্ধ ভাবধারায় জীবনধারণ ইত্যাদি বিষয়গুলো উপস্থাপন করাই অপদানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

অপদানের কাহিনীগুলো হলো প্রাচুর্যপূর্ণ রচনাসম্ভার যা আমরা জাতকসম্ভারেও লক্ষ করি। কিন্তু অপদান জাতকের ন্যায় তত বেশি মূল্যায়িত হয়নি। কারণ, ইতিপূর্বে বাংলাভাষায় অপদান সাহিত্য পুস্তকাকারে আমাদের হাতে আসেনি। স্নেহাস্পদ করুণাবংশ ভিক্ষুর তরুণ হাতে নিখুঁত অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে যতটুকু মনে হয় এই প্রথম সমগ্র অপদান খণ্ডটি ২ খণ্ডে প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তাই উদীয়মান তরুণ এই ভিক্ষুর উদ্যোগকে সাধুবাদের সাথে সুস্বাগতম জানাচ্ছি।

এ গ্রন্থের বর্ণনা, বিষয়সূচি, রচনাশৈলী ইত্যাদি সাধারণত থেরগাথা, থেরীগাথা এবং বিমানবন্ধুর ন্যায় দেখা যায়। কিন্তু কিছু কিছু অপদানের কাহিনী থের বা থেরীগাথার কাহিনী থেকে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে, যেমন: কৃশা গৌতমী ও পটাচারা।

অপদানের বিষয়গুলো পরবর্তীকালে রচিত দুটি পালি গ্রন্থ; যেমন: সুধাচরিত ও রসবাহিনীতেও কিছু কিছু অংশ দেখা যায়। এমনকি আরও অনেক পরে রচিত দুটি সিংহলী গ্রন্থ; যেমন : পূজাবলী এবং কঠিননিসংসয়েও অপদানের কিছু কিছু কাহিনী দেখা যায়।

যত সহজে আমরা অনূদিত বইগুলো হাতে পাই তত সহজে এই বইগুলো হাতে আসতে পারত না এবং হাতে আসলেও সুখকর পাঠ্য যদি না হয় তাহলে অনুবাদকের প্রয়াস এবং এর সাথে যারা সংশ্লিষ্ট সবার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। আমার মনে হয় অপদানের এই অনুবাদ সেদিক থেকে সার্থক হয়েছে। গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে কিছু কিছু নতুন তথ্য ও তত্ত্ব দেখা যায়, আশা করি সুধী পাঠক সমাজ তা খুঁজে নেবেন এবং নিজের জ্ঞানের ভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধশালী করে তুলবেন। তরুণ অনুবাদক করুণাবংশ ভিক্ষু এ পর্যন্ত যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন তা পাঠক সমাজে যথেষ্ট সমাদর পেয়েছে। আশা করি তাঁর দ্বারা অনূদিত খুদ্দকনিকায়ে অপদান গ্রন্থটিও সমভাবে সমাজে সমাদৃত হবে এবং পাঠকের ধর্মপিপাসা মিটাতে আরও নতুন নতুন বই প্রকাশে অনুপ্রাণিত হবে-এই প্রত্যাশা রেখে তাঁর নীরোগ ও সুদীর্ঘ জীবন কামনা করছি।


ড. জ্ঞান রত্ন মহাথেরো

সহযোগী অধ্যাপক পালি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.