আমাদের সৌভাগ্য বলতে হবে, এই পদ্ধতিতে কঠিন চীবর দানের একটি উল্লেখ রয়েছে হত্থবনগল্লবিহার (Hatthavanagallavihāra) নামক একটি পালি গ্রন্থে। এই পালি গ্রন্থটি রচিত হয় ত্রয়োদশ শতকে। এটি শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত হত্থবনগল্ল বিহারের (বর্তমান নাম অট্টনগল্ল বিহার) ইতিহাস নিয়ে রচিত একটি গ্রন্থ।
সেখানে বলা হয়েছে—
“ কদাচিৎ সংঘকে কঠিন চীবর দান করতে ইচ্ছুক হয়ে রাজা পরাক্রমবাহু তুলা থেকে সুতা কাটা ইত্যাদি যাবতীয় করণীয় কাজ এক দিনেই সম্পন্ন করিয়ে প্রত্যেককে অনেক দামি ও ভারী জিনিসপত্রসহ, শ্রমের উপযোগী উপকরণ সমন্বিত আশিটি কঠিন চীবর দানের ব্যবস্থা করে সাধুবাদে জগতের দশ দিক পূর্ণ করেছিলেন।”
— হত্থবনগল্লবিহারবংস, গাথা ১১৯২।
এর অর্থ হলো, লঙ্কাদ্বীপের রাজা পরাক্রমবাহু জগতে বুদ্ধশাসনের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শনের সময় কখনো কখনো সংঘকে কঠিন চীবর দিতে ইচ্ছুক হতেন। তখন তিনি তুলা থেকে সুতা কাটা, কাপড় বোনা, চীবর সেলাই করা ইত্যাদি যাবতীয় করণীয় কাজ এক দিনেই সম্পন্ন করিয়ে প্রত্যেককে অনেক দামি ও ভারী জিনিসপত্র এবং শ্রমের উপযোগী উপকরণসহ আশিটি কঠিন চীবর দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন।
এর মানেই হচ্ছে, এভাবে এক দিনে তুলা থেকে সুতা কেটে, কাপড় বুনে ও চীবর সেলাই করে দানের ঐতিহ্য প্রাচীনকালেও শ্রীলঙ্কায় ছিল। যদিও এখন সম্ভবত সেই ঐতিহ্য তারা প্রায় হারিয়ে ফেলতে বসেছে।
কিন্তু সেই ঐতিহ্য পূজ্য বনভান্তে কীভাবে পেয়েছিলেন, সেটি হয়তো আরেকটি রহস্য হয়ে থাকবে।
👉 প্রথম ধাপ: কঠিন বস্ত্র দান
অতীতের দায়কেরা এখনকার সময়ের মতো তৈরি করা কঠিন চীবর দান করতেন না; বরং কঠিন চীবর তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বস্ত্র দান করতেন। মহাবর্গ অট্ঠকথা অনুসারে, শুধু গৃহীরাই নন, দেবতারাও কঠিন বস্ত্র দান করতে পারেন। এ ছাড়া পাঁচজন সহধর্মী—অর্থাৎ যেকোনো ভিক্ষু, ভিক্ষুণী, শ্রামণ, শ্রামণী অথবা শিক্ষমাণাও কঠিন বস্ত্র দান করতে পারেন।
ঐতিহ্য অনুসারে, দাতার শুধু কঠিন বস্ত্রই নয়, এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় আরও কিছু উপকরণ সরবরাহ করার দায়িত্ব থাকে। তাই কোনো দাতা যদি জিজ্ঞাসা করেন, “ভান্তে, কীভাবে কঠিন দান করা উচিত?” তখন তাঁকে এভাবে শেখানো উচিত—
“তিনটি চীবরের মধ্যে যেকোনো একটির জন্য যথেষ্ট পরিমাণ বস্ত্র সূর্যোদয়ের সময় ‘কঠিন চীবর দিচ্ছি’ বলে দান করা যায়। চীবরটি প্রস্তুত করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ সূচ, সুতা ও রং দিতে হয়। চীবর প্রস্তুতকারী ভিক্ষুদের জন্য প্রয়োজন অনুসারে যাগু ও ভাতও দেওয়া যায়।”
অতীতে কঠিন চীবর সেলাই করার জন্য এসব সূচ, সুতা ইত্যাদির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বর্তমানে তৈরি পোশাকের মতো সেলাই করা চীবর সহজেই পাওয়া যায়। ফলে এসব উপকরণের প্রয়োজনীয়তা এখন আর আগের মতো দেখা যায় না।
👉 দাতার কাছে কঠিন বস্ত্র চাওয়া যায় না
কঠিন বস্ত্র হতে হবে ইঙ্গিতবিহীন অথবা আলোচনা-বিহীন।² ভিক্ষুরা কোনো দাতাকে ‘কঠিন বস্ত্র দিন’ অথবা ‘কঠিন বস্ত্র লাগবে’ বলে বলতে পারেন না। এমনকি নিজের মাকেও নয়। কোনো কথা নেই, কোনো বার্তা নেই—হঠাৎ আকাশ থেকে পড়ার মতো হলে তবেই সেটি কঠিন বস্ত্র বা চীবর কঠিন চীবরের জন্য উপযুক্ত হয়।
এখানে ইঙ্গিতবিহীন বলতে বোঝানো হয়েছে—“এই কাপড় দিয়ে কঠিন চীবর তৈরি করব”—এভাবে কোনো ভিক্ষু ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন, এমন নয়। অথবা, “এই কাপড়টি সুন্দর। এটি দিয়ে কঠিন চীবর তৈরি করা যাবে”—এভাবে ইঙ্গিত করে কাপড়টি গ্রহণ করেছেন, এমনও নয়।
আলোচনাবিহীন বলতে বোঝানো হয়েছে—“কঠিন চীবর দেওয়া উচিত। কঠিন চীবরদাতা অনেক পুণ্য লাভ করেন”—এ ধরনের আলোচনা বা কথাবার্তার মাধ্যমে বস্ত্রটি পাওয়া যায়নি।¹ এ রকম হলে তবেই সেটি কঠিন চীবরের উপযুক্ত বস্ত্র হয়।
👉 কঠিন বস্ত্র নতুন অথবা পুরোনো হতে পারে
কঠিন বস্ত্র একেবারে নতুন হতে পারে, অথবা নতুনের মতোও হতে পারে। আবার পুরোনো, এমনকি পরিত্যক্ত বস্ত্রও হতে পারে। দোকানে ফেলে রাখা পরিত্যক্ত কাপড়ও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
অর্থকথা অনুসারে,³ নতুন বলতে একেবারে অব্যবহৃত বস্ত্র বোঝায়। নতুনের মতো বলতে এমন বস্ত্র বোঝায়, যা একবার বা দুবার ধোয়া হয়েছে।
পরিত্যক্ত বস্ত্র বলতে একুশটি স্থান থেকে প্রাপ্ত পরিত্যক্ত বস্ত্র বোঝায়। পরিত্যক্ত বস্ত্রধারী ভিক্ষু ঘুরে ঘুরে কাপড়ের টুকরা সংগ্রহ করে সেই কাপড়ের টুকরা দিয়ে চীবর তৈরি করলেও সেটি কঠিন চীবরের উপযুক্ত হতে পারে। কুরুন্দী ও মহাপচ্চরী অট্ঠকথায় এমন কথা বলা হয়েছে।
দোকানের পরিত্যক্ত বস্ত্র বলতে দোকানের দরজায় পড়ে থাকা কাপড়ের টুকরা বোঝায়। কেউ সেই কাপড়ের টুকরা কঠিন চীবর তৈরির জন্য দেয় সেটিও কঠিন বস্ত্র হিসেবে গণ্য হয়।
সহজ কথায়, বস্ত্র নতুন হোক বা পুরোনো হোক, দাতা সেটি কঠিন বস্ত্র হিসেবে দান করতে পারে।
বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৌদ্ধরা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কঠিন চীবর দান করে থাকেন। বার্মায় সাধারণত কোনো একজন দায়ক থাকে। তিনি সেখানে উপস্থিত ভিক্ষুদের চীবরসহ যাবতীয় দানীয় সামগ্রী দান করে থাকেন।
সূত্র ও টীকা:
মহাবগ্গপালি অট্ঠকথা — ৭. কথিনক্খন্ধক,পৃষ্ঠা ৩০৮।
মহাবগ্গপালি — ৭. কথিনক্খন্ধক,পৃষ্ঠা ৩০৯।
মহাবগ্গপালি অট্ঠকথা — ৭. কথিনক্খন্ধক,পৃষ্ঠা ৩০৬।
একুশটি পরিত্যক্ত বস্ত্রের স্থান:
শ্মশানের বস্ত্র, দোকানের বস্ত্র, রাজপথের বস্ত্র, আবর্জনার, স্তূপের বস্ত্র, প্রসববস্ত্র, গোসলের বস্ত্র
ঘাটের বস্ত্র, প্রত্যাগত বস্ত্র
অগ্নিদগ্ধ বস্ত্র, গরুতে খাওয়া বস্ত্র, উইপোকায় খাওয়া বস্ত্র, ইঁদুরে খাওয়া বস্ত্র, প্রান্ত ছেঁড়া বস্ত্র, পাড় ছিন্ন বস্ত্র, পতাকা স্তূপের চীবর, শ্রমণ বা সন্ন্যাসীর চীবর, অভিষেক বস্ত্র, অলৌকিক বস্ত্র, পথের বস্ত্র, বাতাসে উড়ে আসা বস্ত্র, দেবতার দেওয়া বস্ত্র, সামুদ্রিক বস্ত্র।
সূত্র: বিশুদ্ধিমগ্গ — ২. ধুতঙ্গনিদ্দেস।
👉 দ্বিতীয় ধাপ: কঠিন বিস্তারকারী ভিক্ষু নির্বাচন
কঠিন বস্ত্র দান করলেই দায়কের কাজ শেষ। এরপর সেই বস্ত্র কেটে, সেলাই করে ও রং করে চীবর তৈরি করে তা দিয়ে কঠিন বিস্তার করার দায়িত্ব পড়ে একজন উপযুক্ত ভিক্ষুর ওপর। সেই উপযুক্ত ভিক্ষু কে হবেন, তা নির্ধারণের দায়িত্ব ভিক্ষুসংঘের উপরেই পড়ে।
এক্ষেত্রে সংঘের সেই কঠিন বস্ত্র কাকে দেওয়া উচিত? অর্থকথা অনুসারে, যাঁর চীবর জীর্ণশীর্ণ হয়ে গেছে, তাঁকেই দেওয়া উচিত। যদি জীর্ণ চীবরধারী অনেক ভিক্ষু থাকেন, তাহলে বয়োজ্যেষ্ঠ ভিক্ষুকে দিতে হবে। বয়োজ্যেষ্ঠ ভিক্ষুদের মধ্যে যাঁর পরিষদ বড়, যিনি সেদিনই চীবর প্রস্তুত করে কঠিন বিস্তার করতে পারবেন, তাঁকেই দিতে হবে। যদি বয়োজ্যেষ্ঠ ভিক্ষুরা তা করতে না পারেন, কিন্তু কোনো তরুণ ভিক্ষু তা করতে পারেন, তাহলে সেই তরুণ ভিক্ষুকেই দিতে হবে। অধিকন্তু, সংঘের কর্তব্য হলো মহাথেরদের সেবাযত্ন করা। তাই সংঘের পক্ষ থেকে বলা উচিত, “ভান্তে, এটি আপনি গ্রহণ করুন। আমরা চীবর প্রস্তুত করে দেব।”তিন চীবরের মধ্যে যে চীবরটি জীর্ণ হয়েছে, সেই চীবরটির জন্যই কঠিন বস্ত্র দিতে হবে।
স্বাভাবিকভাবে, দুটি পরতবিশিষ্ট চীবর হলে দুটি পরতের জন্যই বস্ত্র দিতে হবে। যদি এক পরতবিশিষ্ট চীবরটি ঘন হয়, অথচ কঠিন বস্ত্রটি পাতলা হয়, তাহলে যথাযথভাবে চীবর তৈরির জন্য দুটি পরতের সমপরিমাণ বস্ত্র দেওয়া উচিত।
“না পেলে এক পরতই পরিধান করব”—এমন কথা বললেও দুটি পরতের জন্য বস্ত্র দেওয়া যায়। কিন্তু যিনি লোভী স্বভাবের, তাকে দেওয়া উচিত নয়। আবার, “কঠিন বিস্তারের পর সেলাই করে দুটি চীবর বানাব”—এ কথা বললেও আমলে নেওয়া উচিত নয়।
সংঘ কর্তৃক নির্বাচিত ভিক্ষুকে কঠিন চীবর দান করা হচ্ছে বিজ্ঞপ্তি-দ্বিতীয় সংঘকর্ম (ঞত্তিদুতিয়কম্ম)। অর্থাৎ, এখানে একটি বিজ্ঞপ্তি এবং একটি ঘোষণা করতে হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে এই সংঘকর্ম সম্পাদন করতে গিয়ে অভিজ্ঞ ও সমর্থ ভিক্ষুকে সংঘের কাছে এভাবে জানাতে হবে—
“সুণাতু মে, ভন্তে, সংঘো। ইদং সংঘস্স কঠিনদুস্সং উপ্পন্নং। যদি সংঘস্স পত্তকল্লং, সংঘো ইদং কঠিনদুস্সং ইমস্স ভিক্খুনো দদেয়্য কঠিনং অত্থরিতুং। এসা ঞত্তি।
সুণাতু মে, ভন্তে, সংঘো। ইদং সংঘস্স কঠিনদুস্সং উপ্পন্নং। সংঘো ইদং কঠিনদুস্সং ইমস্স ভিক্খুনো দেতি কঠিনং অত্থরিতুং। যস্সাযস্মতো খমতি ইমস্স কঠিনদুস্সস্স ইমস্স ভিক্খুনো দানং কঠিনং অত্থরিতুং, সো তুণ্হস্স; যস্স নক্খমতি, সো ভাসেয়্য।
দিন্নং ইদং সংঘেন কঠিনদুস্সং ইমস্স ভিক্খুনো কঠিনং অত্থরিতুং। খমতি সংঘস্স, তস্মা তুণ্হী, এবমেতং ধারয়ামি।”
বাংলা অনুবাদ হচ্ছে এ-রকম,
“মাননীয় ভন্তে, সংঘ আমার কথা শুনুন। সংঘের এই কঠিন বস্ত্র উৎপন্ন হয়েছে। সংঘের যদি উপযুক্ত সময় হয়, তাহলে সংঘ এই কঠিন বস্ত্র অমুক নামের ভিক্ষুকে কঠিন বিস্তৃত করার জন্য দিতে পারে। এটাই বিজ্ঞপ্তি।”
“মাননীয় ভন্তে, সংঘ আমার কথা শুনুন। সংঘের এই কঠিন বস্ত্র উৎপন্ন হয়েছে। সংঘ এই কঠিন বস্ত্র অমুক নামের ভিক্ষুকে কঠিন বিস্তারের জন্য দিচ্ছে। যে আয়ুষ্মানের এই কঠিন বস্ত্র অমুক ভিক্ষুকে কঠিন বিস্তারের জন্য দেওয়া সমর্থনযোগ্য মনে হয়, তিনি নীরব থাকুন। যার সমর্থনযোগ্য মনে হয় না, তিনি তা বলতে পারেন। এই কঠিন বস্ত্র অমুক নামের ভিক্ষুকে কঠিন চীবর বিস্তারের জন্য দেওয়া হলো। সংঘের সম্মতি আছে, তাই সংঘ নীরব রয়েছে। আমি এভাবেই ধরে নিচ্ছি।”
সূত্র:
১। মহাবগ্গপালি অর্থকথা-৭. কথিনক্খন্ধক,পৃষ্ঠা ৩০৭।
২। বিনয়ালঙ্কার-টীকা — ২৯. কথিনত্থারবিনিচ্ছয়কথা।
৩। মহাবগ্গপালি — সপ্তম কথিনকখন্ধক, পৃষ্ঠা ৩০৭।
বর্তমানে তো কঠিন বস্ত্রের পরিবর্তে সম্পূর্ণ তৈরি চীবরও পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রেও উপরোক্ত নিয়ম অনুসারে বলা যায়।
তবে মিয়ানমারে গৃহীরা কঠিন চীবর দান করলে, অনুষ্ঠান শেষে সংঘের ভিক্ষুরা একত্রিত হন। সেই সমবেত সংঘের মধ্যে কোনো একজন ভিক্ষু জিজ্ঞাসা করেন, কার চীবর পুরোনো হয়ে গেছে। তিনবার জিজ্ঞাসা করার পরও কেউ কিছু না বললে, তখন তিনি প্রস্তাব করেন, “তাহলে এটি সংঘস্থবিরকে দেওয়া হোক।” এভাবে আগে থেকেই বিষয়টি ঠিক করে নেওয়ার পর, আনুষ্ঠানিকভাবে উপরে যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেভাবেই পালি ভাষায় কর্মবাক্য পাঠ করা হয়।
👉 তৃতীয় ধাপ: ভিক্ষুসংঘের কঠিন চীবর প্রস্তুতকরণ
কঠিন চীবরের জন্য বস্ত্র দান পাওয়া গেলে, সেই বস্ত্র দিয়ে চীবর প্রস্তুত করার দায়িত্ব ভিক্ষুসংঘের ওপরই বর্তায়। “আমি স্থবির” অথবা “আমি বহু শ্রুতিধর”—এমন পরিচয় দিয়ে কোনো ভিক্ষুই চীবর প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন না। সবাই মিলে ধোয়া, সেলাই ও রং করার কাজ সম্পন্ন করতে হয়। অনেক সময় এই কাজ ভিক্ষুসংঘের জন্য একটি বিশাল কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়ে দাঁড়ায়।¹
কঠিন বস্ত্র যেদিন পাওয়া যায়, সেদিনই ভিক্ষুসংঘের সদস্যদের সম্মিলিতভাবে তা ধুয়ে, কেটে ও সেলাই করে কঠিন চীবর প্রস্তুত করতে হয়। সেটি পরদিনের জন্য ফেলে রাখা যায় না।²
আবার, পরদিন অরুণোদয়ের আগেই চীবরটি প্রস্তুত করে নিতে হয়। চীবর প্রস্তুত করার কাজ চলতে চলতেই যদি অরুণোদয় হয়ে যায়, তাহলে সেটিকে আর কঠিন চীবর করা যায় না।³
তথ্যসুত্র:
মহাবগ্গপালি অট্ঠকথা — ৭. কথিনক্খন্ধক,পৃষ্ঠা ৩০৬।
মহাবগ্গপালি — ৭. কথিনক্খন্ধক, পৃষ্ঠা ৩০৯।
মহাবগ্গপালি অট্ঠকথা — ৭. কথিনক্খন্ধক,পৃষ্ঠা ৩০৮।
👉 কঠিন চীবর কীভাবে সেলাই করতে হয়?
বিনয় পিটকের মহাবর্গের কঠিন অধ্যায়ে বুদ্ধ কঠিন চীবর প্রস্তুত করার পদ্ধতি বোঝাতে বিভিন্ন বিষয়ের অবতারণা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বলেছেন, শুধু দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ নির্ধারণ করলেই কঠিন চীবর তৈরি হয় না। আবার, কয়টি চীবর তৈরি করা হবে, শুধু তা পরিকল্পনা করলেই কঠিন চীবর প্রস্তুত হয় না। এভাবে আরও অনেক বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে।
এ থেকে বোঝা যায়, কঠিন চীবর সেলাই ও রং করার ক্ষেত্রে একাধিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়। প্রথমে চীবরের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ নির্ধারণ করতে হয়। এরপর কয়টি চীবর তৈরি করা হবে, তা পরিকল্পনা করতে হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাপড় কাটতে হয়। তারপর কাপড়কে পাঁচটি বা তারও বেশি খণ্ডে ভাগ করে মহামণ্ডল ও অর্ধমণ্ডল তৈরি করতে হয়। সম্পূর্ণ একখণ্ড কাপড় দিয়ে কিংবা মাত্র দুই, তিন বা চারটি খণ্ড করলে হয় না। এরপর সেলাই করার জন্য কাপড়ে দাগ টানতে হয় এবং সেই দাগ বরাবর সেলাই করতে হয়। সেলাই করার পর চীবর রং করতে হয়। একবার রং করার পরও যদি যথাযথ রং না হয়—যেমন দাঁতের মতো সাদা থেকে যায় অথবা ফ্যাকাশে লাল রং ধারণ করে—তাহলে আবার রং করতে হয়। তবে একবার বা দুবার রং করার পর যদি যথাযথ রং হয়, তাহলে আর রং করার প্রয়োজন নেই।
আনকোরা নতুন কাপড় কিংবা নোংরা কাপড় কঠিন চীবর তৈরির উপযোগী নয়। তাই কঠিন চীবর তৈরির জন্য কাপড় পাওয়ার পর তা ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হয়।
এরপর চীবর প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজনীয় সূঁচসহ অন্যান্য সরঞ্জাম সাজিয়ে নিয়ে বহু ভিক্ষুকে একত্রে সেদিনই চীবর সেলাই করতে হয়। সেলাই শেষ হলে সেদিনই চীবর রং করে যথাযথভাবে কঠিন বিস্তার করতে হয়। এভাবে চীবর সেলাইয়ের কাজটি মূলত ভিক্ষুদের উপরই ছিল।
👉 কঠিন চীবর সেলাইয়ের কাঠামো
বিনয় পিটকের চূল্লবর্গের ক্ষুদ্র বিষয়াবলিসংক্রান্ত অধ্যায়ে চীবর সেলাইয়ের বিষয়ে বেশ কিছু আলোচনা পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, সে সময় ভিক্ষুরা যেখানে-সেখানে খুঁটি পুঁতে তার সঙ্গে কাপড় যুক্ত করে চীবর সেলাই করত। চীবর খুলে পড়ে যেত। বিষয়টি ভগবান বুদ্ধকে জানানো হলে তিনি কঠিন ও কঠিনের রশি ব্যবহারের অনুমতি করলেন।¹
অট্ঠকথা অনুসারে, এই কঠিন মূলত একধরনের মাচা বা কাঠের কাঠামো ছিল। সম্ভবত সেটি মাটির ওপর স্থাপন করা হতো। এর ওপর মাদুর, পাটি ইত্যাদি বিছানো হতো। তারপর তার ওপর কাপড় রেখে চীবর সেলাই করা হতো। চীবরটি টানটান রাখার জন্য রশি দিয়ে সেই কঠিনের কাঠামোতে বেঁধে রাখা হতো।²
👉 কঠিনের কাঠামো সমান জায়গায় স্থাপন করতে হবে
তখন ভিক্ষুরা কঠিনের কাঠামোটি অসমান জায়গায় স্থাপন করতেন। ফলে কাঠামোটি ভেঙে যেত। তখন বুদ্ধ আদেশ জারি করলেন, “হে ভিক্ষুগণ, অসমান জায়গায় কঠিন স্থাপন করা যাবে না। যে স্থাপন করবে, তার দুক্কট অপরাধ হবে।”
👉 কঠিনের কাঠামো সরাসরি মাটিতে স্থাপন করা যাবে না
তখন ভিক্ষুরা কঠিনের কাঠামোটি সরাসরি মাটির ওপর স্থাপন করতেন। ফলে সেটি ময়লাযুক্ত হয়ে যেত। বুদ্ধ তখন কাঠামোটি সরাসরি মাটিতে স্থাপন না করার আদেশ দিলেন। তিনি সেটি তৃণের আস্তরণের ওপর স্থাপন করার নির্দেশ দিলেন।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, শুধু তৃণের আস্তরণ নয়, মাদুর, কার্পেট ইত্যাদি যেকোনো উপযুক্ত আস্তরণের ওপরও কাঠামোটি স্থাপন করা যেতে পারে। মূল কথা হলো, কাঠামোটি সরাসরি মাটিতে না বসালেই হলো।
👉 কঠিনের কাঠামোর আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র
কঠিনের কাঠামোর প্রান্ত জীর্ণ হয়ে যেত। তখন বুদ্ধ সেখানে সেলাই করে পাড় লাগানোর নির্দেশ দিলেন।
তথ্যসূত্র:
১। চুল্লবগ্গপালি, ৫. খুদ্দকবত্থুখন্ধক, ২৫৬।
২। চুল্লবগ্গ অট্ঠকথা, ৫. খুদ্দকবত্থুখন্ধক, ২৫৬।
৩। চুল্লবগ্গপালি, ৫. খুদ্দকবত্থুখন্ধক, ২৫৬।
৪। চুল্লবগ্গপালি, ৫. খুদ্দকবত্থুখন্ধক, ২৫৬।
কঠিনের কাঠামো ঠিকমতো হলো না। অর্থাৎ, দীর্ঘ ভিক্ষুর পরিমাপ অনুযায়ী কঠিনের কাঠামো তৈরি করায় সেখানে হ্রস্ব ভিক্ষুর চীবর বিছালে তা ঠিকমতো হয় না। চীবরটি ছোট হয়ে যেত, অর্থাৎ কাঠামোর প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছাত না। তাই বুদ্ধ দণ্ডকঠিন অনুমোদন করলেন। দণ্ডকঠিন বলতে বোঝায়, মূল কাঠামোর মধ্যে অন্য ভিক্ষুর পরিমাপ অনুযায়ী আরেকটি ছোট কাঠামো তৈরি করা। এর পাশাপাশি বুদ্ধ দ্বিগুণবিশিষ্ট প্রান্ত, শলাকা, মোড়কদড়ি, মোড়কসূতা এবং সূতা দিয়ে চীবর মুড়িয়ে সেলাই করার পদ্ধতিও অনুমোদন করলেন।
অর্থকথা অনুসারে, দ্বিগুণবিশিষ্ট প্রান্ত বলতে দণ্ডকাঠিনের পরিমাপ অনুসারে মাদুরের প্রান্ত ভাঁজ করে দ্বিগুণ করা বোঝায়। শলাকা বলতে চীবরের দুই পরতের মাঝখানে প্রবেশ করানো শলাকা বোঝায়। মোড়কদড়ি বলতে বড় কাঠামোর ভেতরে ছোট কাঠামো বাঁধার দড়ি বোঝায়। মোড়কসূতা বলতে ছোট কাঠামোর সঙ্গে চীবর বাঁধার সূতা বোঝায়। আর সূতা দিয়ে চীবর মুড়িয়ে সেলাই করা বলতে সেই সূতা দিয়ে চীবরটি মুড়িয়ে সেলাই করা বোঝায়।²
কাঠামোয় ব্যবহৃত সুতাগুলোর মধ্যবর্তী ফাঁক অসমান হয়ে গেল। অর্থাৎ, কোনো ফাঁক ছোট, আবার কোনো ফাঁক বড় হলো। তখন বুদ্ধ একটি পরিমাপক ব্যবহার করতে বললেন। এই পরিমাপক হিসেবে মাপ মনে রাখার জন্য তালপাতা বা এ ধরনের যেকোনো বস্তু ব্যবহার করা যেত।
এরপর মোড়কসূতা বাঁকা হয়ে গেল। তখন বুদ্ধ তুচ্ছসূতা ব্যবহার করতে বললেন। তুচ্ছসূতা বলতে কাঠমিস্ত্রিরা কাঠের ওপর কালো দাগ দেওয়ার জন্য যে ধরনের হলুদ রঙের সূতা ব্যবহার করেন, সেই ধরনের সূতা বোঝায়।
সে সময় ভিক্ষুরা আধাভেজা পায়ে, এমনকি স্যান্ডেল পরেও কঠিনের কাঠামোর ওপর পা দিতেন। ফলে কাঠামোটি ক্ষতিগ্রস্ত হতো। তখন বুদ্ধ তা নিষেধ করে বিধান দিলেন। ভেজা পা, ধুলোমাখা পা কিংবা স্যান্ডেল পরা পা নিয়ে কঠিন চীবরের কাঠামোতে পা দেওয়া যাবে না। যে ব্যক্তি এভাবে পা দেবে, তার দুক্কট অপরাধ হবে।
তথ্যসূত্র:
১। চুল্লবগ্গপালি, ৫. খুদ্দকবত্থুখন্ধক, ২৫৬।
২। চুল্লবগ্গ অট্ঠকথা, ৫. খুদ্দকবত্থুখন্ধক, ২৫৬।
৩। চুল্লবগ্গপালি, ৫. খুদ্দকবত্থুখন্ধক,২৫৬ এবং তার অর্থকথা।
৪। চুল্লবগ্গপালি, ৫. খুদ্দকবত্থুখন্ধক,২৫৬ এবং তার অর্থকথা।
👉 কঠিনশালা অনুমোদন
সেই সময় ভিক্ষুরা খোলা আকাশের নিচে চীবর সেলাই করার সময় শীত ও গরমে কষ্ট পেতেন। বিষয়টি ভগবান বুদ্ধকে জানানো হলো। তখন বুদ্ধ কঠিনশালা ও কঠিন হলঘর অনুমোদন করলেন।
কঠিনশালার ভিত্তি নিচু হওয়ায় সেখানে পানি জমে ডুবে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। তখন বুদ্ধ ভিত্তি উঁচু করার নির্দেশ দিলেন। অর্থাৎ মাটি ভরাট করে ভিত্তি উঁচু করা যাবে। কিন্তু স্তূপ ধসে পড়ে গেল। তখন বুদ্ধ তিন ধরনের স্তূপ অনুমোদন করলেন—ইটের স্তূপ, পাথরের স্তূপ ও কাঠের স্তূপ।
কঠিনশালার ভিত্তি উঁচু হওয়ায় সেখানে উঠতে কষ্ট হতো। তখন বুদ্ধ তিন ধরনের সিঁড়ি অনুমোদন করলেন—ইটের সিঁড়ি, পাথরের সিঁড়ি ও কাঠের সিঁড়ি।
সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় ভিক্ষুরা পড়ে যেতেন। তখন বুদ্ধ ধরে ওঠার জন্য রেলিং অনুমোদন করলেন।
কঠিনশালার ছাদ থেকে খড়কুটো পড়ে যেত। তখন বুদ্ধ ছাদের নিচের অংশে প্রলেপ দেওয়ার অনুমোদন দিলেন। অর্থাৎ ছাদের নিচের অংশে কাঠের কাঠামো তৈরি করে তার ভেতরে ও বাইরে মাটি দিয়ে লেপন করা যায়। সেখানে সাদা, কালো ও গেরুয়া রঙের কাজ এবং ফুলের কারুকাজ, লতার কারুকাজ, ছুড়িমাছের দাঁত এবং পাঁচরঙা নকশা তৈরির অনুমোদন দিলেন। তিনি চীবরের বাঁশ ও চীবরের রশি ব্যবহারেরও অনুমোদন করলেন।
সূত্র:
১। চুল্লবগ্গপালি, ৫. খুদ্দকবস্তু-খণ্ডক, পৃ. ২৫৬।
২। চুল্লবগ্গপালি, ৫. খুদ্দকবস্তু-খণ্ডক, পৃ. ২৫৭।
৩। চুল্লবগ্গপালি, ৫. খুদ্দকবস্তু-খণ্ডক, পৃ. ২৫৭ এবং তার অট্ঠকথা।
৪। চুল্লবগ্গপালি, ৫. খুদ্দকবস্তু-খণ্ডক, পৃ. ২৫৭।
৫। চুল্লবগ্গপালি, ৫. খুদ্দকবস্তু-খণ্ডক, পৃ. ২৫৭।
সেই সময় ভিক্ষুরা চীবর সেলাই করে কঠিন চীবরের কাঠামোটি সেখানেই ফেলে রেখে চলে যেতেন। ফলে ইঁদুর ও উইপোকা সেটি নষ্ট করে ফেলত। তখন বুদ্ধ কঠিন চীবরের কাঠামোটি গুটিয়ে রেখে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু এভাবে রাখলে কঠিন চীবরের কাঠামো ভেঙে যেত।
এরপর বুদ্ধ গরুর গলার জোয়ালের মতো একটি কাঠামো ব্যবহার করে কঠিন চীবরের কাঠামোটি গুটিয়ে রাখার নির্দেশ দিলেন। এখানে গরুর গলার জোয়ালের মতো কাঠামো বলতে বাঁশ বা কাঠের এমন একটি দণ্ড বোঝানো হয়েছে, যার মাঝখানে কঠিন চীবরের কাঠামোটি রেখে গুটিয়ে রাখা যায়। কিন্তু তাতেও কঠিন চীবরের কাঠামো খুলে পড়ে গেল। তখন বুদ্ধ কঠিনের চীবরের পুঞ্জিভূত করে রাখার জন্য বাঁধার রশি ব্যবহারের অনুমোদন দিলেন।
আবার সেই সময় ভিক্ষুরা কঠিন চীবরের কাঠামোটি দেয়ালে বা স্তম্ভে তুলে রেখে চলে যেতেন। ফলে কাঠামোটি পড়ে গিয়ে ভেঙে যেত। তখন বুদ্ধ সেটি দেয়ালের খিল অথবা গোঁজে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ দিলেন।
এভাবেই তৎকালীন সময়ে কঠিন চীবর সেলাই করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সাজসরঞ্জামের প্রয়োজন হতো।
👉 বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমান সময়ে সরাসরি তৈরি বা রেডিমেড কঠিন চীবর দান করা যায়। সে ক্ষেত্রে চীবর সেলাই ও রং করার প্রয়োজন হয় না। তাই কঠিন চীবরের কাঠামো বা কঠিনশালারও আর প্রয়োজন হয় না।
বর্তমানে অধিকাংশ চীবর পাঁচটি বা তারও বেশি খণ্ড জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়। যদিও মহাবর্গে সেদিনই পাঁচ খণ্ড বা তারও বেশি খণ্ডে কেটে চীবর সেলাই করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু অর্থকথায় সেদিনই কাপড় কাটতে হবে—এমন কোনো স্পষ্ট নির্দেশ উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে কেবল পাঁচ খণ্ডে কাপড় কেটে সেলাই করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে আমাদের মনে একটি সংশয় জাগে। বুদ্ধ যেখানে সেদিনই কেটে সেলাই করে চীবর তৈরি করতে বলেছেন, সেখানে আমরা কীভাবে রেডিমেড চীবরকে কঠিন চীবর হিসেবে ব্যবহার করতে পারি?
এক্ষেত্রে আমাদের একটি বিষয় মনে রাখা উচিত—বুদ্ধ কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা অর্থকথার রচয়িতারা জানতেন। তাই তাঁরা যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন, সেগুলো উল্লেখ করে গেছেন। সুতরাং এভাবে বিচার করে আমি মনে করি, রেডিমেড কাপড় কেটে সেলাই করে তৈরি করা চীবর দিয়ে কঠিন চীবর সম্পাদন করতে কোনো সমস্যা নেই।
আমার কথা থাকুক। মিয়ানমারের পা-আউক মহাবিহারসহ অন্যান্য কঠোর বিনয় পালনকারী বিহারগুলোতেও এভাবে আগে থেকে সেলাই করা চীবর ব্যবহার করে কঠিন চীবর সম্পাদন করা হয়ে থাকে। সেসব চীবরে যথাযথভাবে পাড় দেওয়া হয় এবং সুন্দরভাবে রং করা হয়। তাই বর্তমানে ভিক্ষুসংঘের সম্মিলিতভাবে কঠিন চীবর সেলাই করার প্রয়োজন পড়ে না।
👉 চতুর্থ ধাপ: কঠিন চীবর বিস্তারের সংঘকর্ম
কঠিন চীবর বিস্তারের পূর্বশর্ত:
কঠিন চীবর বিস্তার করার জন্য কয়েকটি পূর্বশর্ত রয়েছে—
১। সংঘের সদস্যসংখ্যা।
কঠিন চীবর বিস্তারের সংঘকর্ম সম্পাদনের জন্য ভিক্ষুসংঘে কমপক্ষে পাঁচজন ভিক্ষু থাকতে হবে।
২। প্রথম বর্ষাবাস সফলভাবে সম্পন্ন করা কোনো ভিক্ষু প্রথম বর্ষাবাস সফলভাবে সম্পন্ন করলে তিনি কঠিন চীবর বিস্তার করতে পারেন। বর্ষাবাস দুই সময়ে পালন করা যায়—প্রথম বর্ষাবাস: শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন—এই তিন মাস। দ্বিতীয় বর্ষাবাস: ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক—এই তিন মাস। কোনো কারণে শ্রাবণ মাসে প্রথম বর্ষাবাস ভঙ্গ হলে ভাদ্র মাসের প্রথম দিন থেকে পুনরায় দ্বিতীয় বর্ষাবাসের অধিষ্ঠান করা যায়। তবে এভাবে দ্বিতীয় বর্ষাবাস পালনকারী ভিক্ষু কঠিন চীবর বিস্তারের অধিকারী হন না। তবে তিনি কঠিন চীবর বিস্তারের বিনয়কর্মে গণপূরক হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। অর্থাৎ, সংঘকর্ম সম্পাদনের জন্য সংঘের সদস্য হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারেন; কিন্তু নিজে কঠিন চীবর বিস্তার করতে বা কঠিন চীবর বিস্তারের অনুমোদন দিতে পারেন না।
৩। একই সীমার অন্তর্ভুক্ত সব বিহারের ভিক্ষুদের একত্র হওয়া একটি সীমার (সীমা) মধ্যে একাধিক বিহার থাকলে, সেই সীমার অন্তর্ভুক্ত সব ভিক্ষুকে একত্র হয়ে একই স্থানে কঠিন চীবর বিস্তার করতে হবে। আলাদা আলাদাভাবে বিভিন্ন বিহারে কঠিন চীবর বিস্তার করা যায় না।
৪। ত্রিচীবরের যেকোনো একটি দিয়ে কঠিন চীবর বিস্তার কঠিন চীবর বিস্তার করতে হলে ত্রিচীবরের যেকোনো একটি ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ—দোয়াজিক, অন্তর্বাস, উত্তরাসঙ্গ দিয়ে। এই তিন চীবরের যেকোনো একটি দিয়েই কঠিন চীবর বিস্তার করতে হয়। ত্রিচীবরের বাইরে অন্য কোনো চাদর বা কাপড় দিয়ে কঠিন চীবর বিস্তার করা যায় না।
এভাবে ত্রিচীবরের যেকোনো একটি চীবর অধিষ্ঠান ত্রিচীবরের যেকোনো একটি চীবর সেলাই ও রং করা সম্পন্ন হলে, সেটি কপ্পবিন্দু দিতে হয়। কপ্পবিন্দু না দিয়ে কঠিন চীবর বিস্তার করা যায় না।
তথ্যসূত্র:
১। মহাবগ্গপালি অট্ঠকথা, ৭. কথিনক্খন্ধক, পৃ. ৩০৬।
২। মহাবগ্গপালি অট্ঠকথা, ৭. কথিনক্খন্ধক, পৃ. ৩০৭।
৩। মহাবগ্গপালি অট্ঠকথা, ৭. কথিনক্খন্ধক, পৃ. ৩০৮।
👉 ২. কঠিন চীবর অধিষ্ঠান
কপ্পবিন্দু দেওয়ার পর কঠিন চীবর বিস্তারকারী ভিক্ষু যদি দোয়াজিক দিয়ে কঠিন চীবর বিস্তার করতে চান, তাহলে পুরোনো দোয়াজিক প্রত্যাহার করে নতুন দোয়াজিক অধিষ্ঠান করতে হবে। পুরোনো দোয়াজিক প্রত্যাহারের বাক্য:
“ইমং সঙ্ঘাটিং পচ্চুদ্ধরামি।”
অর্থ: আমি এই সঙ্ঘাটি চীবরের অধিষ্ঠান প্রত্যাহার করছি।
এরপর নতুন দোয়াজিক অধিষ্ঠানের জন্য সেটি হাতে নিয়ে অথবা স্পর্শ করে বলতে হবে:
“ইমং সঙ্ঘাটিং অধিট্ঠামি।”
অর্থ: আমি এই সঙ্ঘাটি চীবর অধিষ্ঠান করছি।
একইভাবে উত্তরাসঙ্গ ও অন্তর্বাসের ক্ষেত্রেও পুরোনো অধিষ্ঠান প্রত্যাহার করে নতুন অধিষ্ঠান করতে হবে।
উত্তরাসঙ্গের জন্য:
প্রত্যাহার: “ইমং উত্তরাসঙ্গং পচ্চুদ্ধরামি।”
নতুন অধিষ্ঠান: “ইমং উত্তরাসঙ্গং অধিট্ঠামি।”
অন্তর্বাসের জন্য:
প্রত্যাহার: “ইমং অন্তরবাসকং পচ্চুদ্ধরামি।”
নতুন অধিষ্ঠান: “ইমং অন্তরবাসকং অধিট্ঠামি।”
👉 ৩. ভিক্ষু কর্তৃক কঠিন বিস্তার
এভাবে ত্রিচীবরের যেকোনো একটি চীবর অধিষ্ঠান করার পর ভিক্ষুকে কঠিন চীবর বিস্তার করতে হয়।
যদি দোয়াজিক দিয়ে কঠিন চীবর বিস্তার করতে চান, তাহলে বলতে হবে:
“ইমায় সঙ্ঘাটিয়া কঠিনং অত্থরামি।”
অর্থ: আমি এই সঙ্ঘাটি চীবর দিয়ে কঠিন চীবর বিস্তার করছি।
সূত্র-
মহাবগ্গপালি অট্ঠকথা — ৭. কঠিনক্খন্ধক,পৃষ্ঠা ৩০৮।
পারাজিককণ্ড-অট্ঠকথা — ৪. নিস্সগ্গিয়কণ্ড।
পরিবারপালি — কঠিনভেদ, পৃষ্ঠা ৪১৩।
উত্তরাসঙ্গ দিয়ে কঠিন বিস্তার
কোনো ভিক্ষু যদি উত্তরাসঙ্গ দিয়ে কঠিন বিস্তার করতে চান, তাহলে তাঁকে বলতে হবে—
পালি: “ইমিনা উত্তরাসঙ্গেন কথিনং অত্থরামি.”
বাংলা অর্থ: “এই উত্তরাসঙ্গ দিয়ে কঠিন বিস্তার করছি।”
আর যদি অন্তর্বাস দিয়ে কঠিন বিস্তার করতে চান, তাহলে তাঁকে বলতে হবে—
পালি: “ইমিনা অন্তরবাসকেন কথিনং অত্থরামি”
বাংলা অর্থ: “এই অন্তর্বাস দিয়ে কঠিন বিস্তার করছি।”
ভিক্ষুসংঘ নিজে কঠিন বিস্তার করেন না। কেবল নির্ধারিত একজন ভিক্ষুই কঠিন বিস্তার করেন। তাই উপরে উল্লেখিত পালি বাক্যটি শুধু কঠিন বিস্তারকারী ভিক্ষুকেই বলতে হয়। তাঁর কথা শোনার পর ভিক্ষুসংঘ সেটার অনুমোদন করবেন।
👉 ভিক্ষুসংঘ কর্তৃক কঠিন বিস্তার অনুমোদন
কঠিন বিস্তারকারী ভিক্ষু কঠিন বিস্তার করার পর সংঘের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানাবেন।
তিনি যদি সংঘের মধ্যে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ভিক্ষু হন, তাহলে চীবরের একাংশ গায়ে দিয়ে করজোড়ে বলবেন—
পালি: "অত্থতং আবুসো সঙ্ঘসস কত্থিনং ধম্মিকো কথিনত্থারো। অনুমোদেথ"
বাংলা অর্থ:
“আবুসো, সংঘের কঠিন বিস্তার সম্পন্ন হয়েছে। কঠিন বিস্তার ধর্মসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আপনারা তা অনুমোদন করুন।”
এরপর অনুমোদনকারী ভিক্ষুরা চীবরের একাংশ গায়ে দিয়ে করজোড়ে বলবেন—
পালি:
"অত্থতং ভন্তে সঙ্ঘসস কত্থিনং ধম্মিকো কথিনত্থারো। অনুমোদাম"
বাংলা অর্থ:
“ভন্তে, সংঘের কঠিন বিস্তার সম্পন্ন হয়েছে। কঠিন বিস্তার ধর্মসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আমরা তা অনুমোদন করছি।”
কঠিন বিস্তারকারী ভিক্ষু যদি সংঘের মধ্যে কনিষ্ঠ হন, তাহলে তিনি চীবরের একাংশ গায়ে দিয়ে করজোড়ে বলবেন—
পালি:
“অত্থতং ভন্তে সঙ্ঘসস কত্থিনং ধম্মিকো কথিনত্থারো। অনুমোদেথ"”
বাংলা অর্থ:
“ভন্তে, সংঘের কঠিন বিস্তার সম্পন্ন হয়েছে। কঠিন বিস্তার ধর্মসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আপনারা তা অনুমোদন করুন।”
কঠিন চীবর অনুমোদন
তখন কঠিন চীবর অনুমোদনকারী ভিক্ষুরা চীবরের একাংশ হাতে করে করজোড়ে বলতে হয়—
পালি:
“অত্থতং, আবুসো, সঙ্ঘস্স কঠিনং। ধম্মিকো কঠিনত্থারো। অনুমোদামি।”
বাংলা অর্থ:
“আবুসো (বন্ধু ভিক্ষু), সংঘের কঠিন চীবর বিস্তার করা হয়েছে। কঠিন চীবর বিস্তার ধর্মসম্মত হয়েছে। আমি তা অনুমোদন করছি।”
এভাবে কঠিন চীবর বিস্তারকারী ভিক্ষু এবং অনুমোদনকারী ভিক্ষুসংঘ—উভয়েরই কঠিন চীবর বিস্তার সম্পন্ন হয়।
এর মধ্য দিয়ে কঠিন চীবরের প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়।
👉 কঠিন চীবরের সুবিধা
কঠিন চীবর বিস্তারকারী ভিক্ষুদের জন্য বুদ্ধ পাটিমোক্খে নির্ধারিত ২২৭টি নিয়মের মধ্যে পাঁচটি নিয়ম শিথিল করে দিয়েছেন। সেগুলো হলো—
১. না জানিয়ে বিচরণ
কঠিন চীবর প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত সতীর্থ ভিক্ষুকে না জানিয়ে বিচরণ করলে কোনো অপরাধ হবে না।
২. ত্রিচীবর না নিয়ে বিচরণ
কঠিন চীবর প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত ত্রিচীবর সঙ্গে না নিয়েও বিচরণ করা যাবে। অর্থাৎ, ত্রিচীবর ছাড়া বসবাস করলে এ ক্ষেত্রে কোনো অপরাধ হবে না।
৩. গণভোজন
কঠিন চীবর প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত গণভোজন করলেও কোনো অপরাধ হবে না।
৪. যত ইচ্ছা চীবর
যত ইচ্ছা চীবর অধিষ্ঠান না করে এবং অংশীদারি মালিকানায় না রেখে নিজের কাছে রাখার সুবিধা পাবেন ভিক্ষু। অর্থাৎ, কঠিন প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত চীবর রাখলে কোনো অপরাধ হবে না।¹
৫. সেখানে যে চীবর লাভ হবে, তা তাঁদেরই হবে
সেই কঠিনসীমার মধ্যে কঠিন প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত যেকোনোভাবে সংঘের জন্য চীবর উৎপন্ন হলে, তা তাঁদেরই হবে। যেমন—মৃত ভিক্ষুর চীবর, সংঘের উদ্দেশ্যে দান করা চীবর অথবা সেখানে উৎপন্ন হওয়ার মাধ্যমে প্রাপ্ত চীবর।
সূত্র ও টীকা:
১। মহাবগ্গপালি, ৭. কঠিনখন্ধক, পৃষ্ঠা ৩০৬–৩০৭।
২। পাচিত্তিয় শিক্ষাপদ: অন্য ভিক্ষুকে না জানিয়ে আমন্ত্রণকারীর বাড়িতে গিয়ে ঘরে ঘরে বিচরণ করার বিধিনিষেধ এবং তার ব্যতিক্রম।
৩। নিস্সগ্গিয় পাচিত্তিয়, ২য় শিক্ষাপদ: গ্রামে বা লোকালয়ে যাওয়ার সময় ত্রিচীবর সঙ্গে নেওয়ার বিধান। কঠিন চীবরের অনুমোদিত সুবিধার কারণে নির্দিষ্ট শর্তে ত্রিচীবর নিরাপদ স্থানে রেখে যাওয়া যায়। মহাবগ্গপালি, ৮. চীবরখন্ধক, পৃষ্ঠা ৩৬২ এবং তার অট্ঠকথা।
৪। পাচিত্তিয়, ৩২তম শিক্ষাপদ: গণভোজনসংক্রান্ত বিধান।
👉 কঠিনের সুবিধা — শ্রামণদের জন্য
শ্রামণরাও কঠিনের ভাগ পান। অর্থাৎ, ভিক্ষুদের জন্য যে পঞ্চম সুবিধাটি রয়েছে, শ্রামণরাও সেই সুবিধা পান। এ ক্ষেত্রে তাঁদের ভিক্ষুদের মতো অনুমোদনেরও প্রয়োজন হয় না। অনুমোদন ছাড়াই তাঁরা সেই কঠিনে প্রাপ্ত চীবর ও অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রীর সমান অংশীদার হন।
তবে বিনয়লঙ্কার টীকা অনুসারে, তাঁরা যদি কাজ না করেন, তাহলে মাত্র অর্ধেক অংশ পান।
👉 কঠিনের সুবিধাগুলোর মেয়াদকাল
ভিক্ষুদের এই সুবিধাগুলোর একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে। সেই মেয়াদ হলো বর্ষার শেষ মাস, অর্থাৎ কার্তিক মাস, এবং হেমন্তের চার মাস—অর্থাৎ অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত।
এভাবে কঠিন বিস্তারকারী ভিক্ষুদের জন্য ফাল্গুনী পূর্ণিমা পর্যন্ত কঠিনের সুবিধাগুলো বলবৎ থাকে।
কিন্তু কঠিন বিস্তার না করলে তাঁরা এই সুবিধাগুলো পান না। ভিক্ষুদের জীবন কিছুটা সহজ করার উদ্দেশ্যে বুদ্ধ এই কঠিনের সুবিধাগুলো অনুমোদন করেছেন। তবে তা কেবল কঠিন বিস্তারকারী ভিক্ষুদের জন্যই এবং মাত্র পাঁচ মাস পর্যন্ত তাঁরা এই সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারেন।
ফাল্গুনী পূর্ণিমার পর থেকে ভিক্ষুদের জন্য এই নিয়মগুলো আগের মতোই আবার কার্যকর হয়। তাই কঠিনের বিশেষ সুবিধাগুলো ফাল্গুনী পূর্ণিমার পর আর থাকে না।
পাদটীকা:
১। নিস্সগ্গিয় পাচিত্তিয় ১-এর শিক্ষাপদ অনুসারে, ভিক্ষুরা অধিষ্ঠান বা অংশীদারি মালিকানায় না রেখে অতিরিক্ত চীবর দশ দিনের বেশি রাখতে পারেন না। কিন্তু কঠিন বিস্তার করলে ভিক্ষুরা ইচ্ছামতো চীবর রাখতে পারেন।
২। মহাবগ্গপালি, ৭. কথিনখন্ধক, পৃষ্ঠা ৩০৬।
👉 কঠিনের কার্যকারিতা প্রত্যাহার
কোনো ভিক্ষু বর্ষাবাস সম্পন্ন করে কঠিন চীবর বিস্তার করার পর তাঁর জন্য বিনয়ের পাঁচটি নিয়ম কিছুটা শিথিল হয়। এই শিথিলতার অনুমোদন সাধারণত পরবর্তী পাঁচ মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকে। অর্থাৎ, কঠিনের কার্যকারিতাও তত মাস পর্যন্ত থাকে।
কিন্তু এই সময়ের মধ্যেও কঠিনের কার্যকারিতা প্রত্যাহার হতে পারে, যদি ভিক্ষু সেই আবাস থেকে অন্য কোথাও চলে যান।
ধরা যাক, কঠিন চীবর বিস্তারের পর ভিক্ষু এদিক-ওদিক ঘুরতে গেলেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর ফিরে আসার ইচ্ছা থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর কঠিনের কার্যকারিতা বজায় থাকে। কিন্তু যে মুহূর্তে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে আর ফিরে আসবেন না, সেই মুহূর্তেই তাঁর কঠিনের কার্যকারিতা প্রত্যাহার হয়ে যায়। ফলে প্রাতিমোক্ষের পাঁচটি নিয়ম শিথিল রাখার সুযোগও আর থাকে না।
কঠিনের কার্যকারিতা কীভাবে প্রত্যাহার হয়, তা কঠিন অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এই আলোচনার মূল কথা হলো—ভিক্ষু যে স্থানে বর্ষাবাস সম্পন্ন করেছেন, সেখানে তিনি থাকবেন কি না, অথবা বাইরে গেলেও ফিরে আসবেন কি না, সেটিই এখানে প্রধান বিষয়।
যে স্থানে বর্ষাবাস সম্পন্ন করেছেন, সেখানে থাকলে অথবা সেখানে ফিরে আসার ইচ্ছা থাকলে তাঁর কঠিনের কার্যকারিতা বজায় থাকে। কিন্তু যে মুহূর্তে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে আর সেখানে থাকবেন না এবং সেই স্থান ত্যাগ করেন, অথবা বাইরে গিয়ে আর ফিরে না আসার সিদ্ধান্ত নেন, তখনই তাঁর কঠিনের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়। এরপর প্রাতিমোক্ষের পাঁচটি নিয়ম শিথিল রাখার সুবিধাও আর থাকে না।
উদাহরণ: কান্দেবছড়া বনবিহার। ধরা যাক, একজন ভিক্ষু কান্দেবছড়া বনবিহারে বর্ষাবাস সম্পন্ন করেছেন এবং সেখানে কঠিন চীবর বিস্তার করেছেন। কঠিন চীবর বিস্তারের অনুমোদন কার্যকর হওয়ার পর থেকে তিনি বিনয়ের পাঁচটি নিয়ম শিথিলভাবে পালন করে চলার সুযোগ পাবেন।
কিন্তু যদি তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে আর সেখানে থাকবেন না এবং কান্দেবছড়া বনবিহার ত্যাগ করে চলে যান, তাহলে সেই বিহারের সীমানা অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর কঠিনের কার্যকারিতা প্রত্যাহার হয়ে যায়। ফলে তিনি আর কঠিনের সুবিধার অজুহাতে প্রাতিমোক্ষের পাঁচটি নিয়ম শিথিলভাবে পালন করে চলতে পারবে না।
বিস্তারিত বিনয় মহাবর্গের কঠিন অধ্যায়ে দেখুন। আমি সেটি পরিশিষ্টে যোগ করে দিয়েছি।
👉 কঠিন প্রত্যাহারের পালি সূত্র
কঠিন প্রত্যাহার ব্যক্তির মাধ্যমেও হয়, আবার পরিস্থিতির কারণেও হয়। সংঘের সব ভিক্ষু একমত হয়েও কঠিন প্রত্যাহার করতে পারেন। সংঘ যদি কঠিন প্রত্যাহার করতে চায়, তাহলে সংঘকর্মের মাধ্যমে তা প্রত্যাহার করতে হয়। এই সংঘকর্মের নাম বিজ্ঞপ্তি-দ্বিতীয় সংঘকর্ম (ঞত্তিদুতিয়কম্ম)। এতে একটি বিজ্ঞপ্তি (ঞত্তি) এবং একটি ঘোষণা (অনুসাবনা) করতে হয়।
এর মূল পালি সূত্র বিনয় পিটকের পাচিত্তিয় গ্রন্থের ভিক্ষুণীবিভঙ্গে দেওয়া হয়েছে। সূত্রটি হলো—
পালি মূল
সুণাতু মে, ভন্তে, সংঘো। যদি সংঘস্স পত্তকল্লং, সংঘো কঠিনং উদ্ধরেয্য। এসা ঞত্তি।
সুণাতু মে, ভন্তে, সংঘো। সংঘো কঠিনং উদ্ধরতি। যস্সায়স্মতো খমতি কঠিনস্স উদ্ধরো, সো তুণ্হস্স; যস্স নক্খমতি, সো ভাসেয্য।
উদ্ধতং সংঘেন কঠিনং, খমতি সংঘস্স, তস্মা তুণ্হী, এবমেতং ধারযামীতি।
এর বাংলা অনুবাদ হচ্ছে,
“মাননীয় ভন্তে, সংঘ আমার কথা শুনুন। সংঘের যদি উপযুক্ত সময় হয়, তাহলে সংঘ কঠিন প্রত্যাহার করতে পারে। এটিই বিজ্ঞপ্তি।”
“মাননীয় ভন্তে, সংঘ আমার কথা শুনুন। সংঘ কঠিন প্রত্যাহার করছে। কঠিন প্রত্যাহারে যাঁর সম্মতি আছে, তিনি নীরব থাকুন। যাঁর সম্মতি নেই, তিনি তা বলুন।”
“সংঘ কঠিন প্রত্যাহার করেছে। সংঘের এতে সম্মতি আছে। তাই সংঘ নীরব রয়েছে। এভাবেই আমি বিষয়টি ধারণ করছি।”
“সংঘের কঠিন প্রত্যাহার করা হলো। সংঘের সম্মতি আছে, তাই সংঘ নীরব রয়েছে। আমি এটিকে সম্মতি হিসেবেই গ্রহণ করছি।”
সূত্র:
১। বিনয় পিটক, মহাবগ্গ, কঠিনখন্ধক, ৭. কঠিনখণ্ডক, পৃ. ৩১১–৩২৫।
২। বিনয়ালঙ্কার টীকা, ২৯. কঠিনত্থারবিনিচ্ছয়কথা।
৩। পাচিত্তিয় পালি, ৪. পাচিত্তিয়কণ্ড (ভিক্ষুণীবিভঙ্গ), পৃ. ২২৬।
Post a Comment